সন্ধ্যা নামলেই পাড়া-মহল্লার মোড়, বাজার, সড়কের পাশে কিংবা নির্দিষ্ট আড্ডাস্থলে কিশোরদের জটলা। কেউ আড্ডায়, কেউ অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরায়। কিশোর গ্যাং, মাদক, অনলাইন জুয়া ও অপরাধপ্রবণতা ঠেকাতে এবার সন্ধ্যার পর একযোগে মাঠে নেমেছে চাঁদপুরের পুলিশ। পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানের নির্দেশে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত জেলার আট উপজেলায় পৃথক বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩৭০ কিশোরকে আটক করা হয়েছে। পরে যাচাই-বাছাই শেষে অধিকাংশ কিশোরকে অভিভাবকদের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এক রাতেই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশের এমন সমন্বিত অভিযানে কিশোরদের সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পুলিশ বলছে, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই সতর্ক করা, তাদের পড়াশোনায় ফেরানো এবং অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল করাই এ অভিযানের মূল লক্ষ্য। তবে সুনির্দিষ্ট অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন থানার একাধিক দল সন্ধ্যার পর বাজার, সড়কের মোড়, বাণিজ্যিক এলাকা ও কিশোরদের আড্ডাস্থলে অভিযান চালায়। এ সময় অপ্রয়োজনে বাইরে ঘোরাফেরা ও আড্ডায় অবস্থান করা কিশোরদের আটক করে থানায় নেওয়া হয়। পরে তাদের পরিচয়, বয়স ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করা হয় এবং অভিভাবকদের থানায় ডেকে সতর্ক করা হয়।
মতলব উত্তরে কিশোর গ্যাংবিরোধী বিশেষ অভিযানে ৫৩ জনকে আটক করে পুলিশ। রোববার সন্ধ্যায় উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের থানায় নেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও চাঁদপুরের পুলিশ সুপারের দিকনির্দেশনায় এবং মতলব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) জাবির হাসনাইন সানির নির্দেশে মতলব উত্তর থানার ওসি কামরুল হাসানের তত্ত্বাবধানে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
ওসি কামরুল হাসান জানান, আটক ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাই-বাছাই চলছে। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া যাবে না, তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতলব সার্কেলের এএসপি জাবির হাসনাইন সানি বলেন, “আমাদের মূল বার্তা হলো—সন্ধ্যার পর কোনো শিক্ষার্থী পড়ার টেবিল ছেড়ে বাইরে আড্ডা দিতে পারবে না। কিশোরদের পড়ালেখায় ফিরিয়ে আনা, মাদক থেকে দূরে রাখা ও অপরাধমুক্ত রাখতে এ অভিযান চালানো হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ফরিদগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ এরশাদ উল্যাহর সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৪১ কিশোরকে আটক করা হয়। এসআই হুমায়ূন কবিরের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল উপজেলার বিভিন্ন মোড়, বাণিজ্যিক এলাকা ও কিশোরদের আড্ডাস্থলে অভিযান চালায়।
পরে আটক কিশোরদের অভিভাবকদের থানায় ডেকে সন্তানদের চলাফেরার ওপর নজর রাখা এবং সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে বাইরে না পাঠানোর বিষয়ে লিখিত মুচলেকা নেওয়া হয়। এরপর অভিভাবকদের জিম্মায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
ফরিদগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ এরশাদ উল্যাহ বলেন, কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখা, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শাহরাস্তিতে রাতে অযাচিত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঘোরাফেরার অভিযোগে ৪৫ কিশোরকে আটক করে পুলিশ। ওসি মীর মাহবুবুর রহমানের দিকনির্দেশনায় থানা পুলিশের একাধিক দল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে।
পুলিশ জানায়, রাতে ঘোরাফেরার কারণ জানতে চাওয়া হলে তারা সন্তোষজনক কোনো কারণ জানাতে পারেনি। পরে অভিভাবকদের থানায় ডেকে ভবিষ্যতে রাতে অযাচিতভাবে ঘোরাফেরা না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়।
আটক কিশোরদের থানার রেকর্ডপত্র ও সিডিএমএস পর্যালোচনা করে কোনো বিরূপ তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রথমবারের মতো সংশোধনের সুযোগ হিসেবে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
চাঁদপুর সদর মডেল থানা পুলিশ পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৩৫ কিশোরকে আটক করে। পরে তাদের পরিবারের সদস্যদের থানায় ডেকে সন্তানদের গতিবিধির বিষয়ে সতর্ক করা হয়। সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে বাইরে ঘোরাফেরা ও আড্ডায় না থাকার বিষয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে কিশোরদের পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই সতর্ক করা এবং অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি নজরদারি বাড়াতে উৎসাহিত করাই এ অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মতলব দক্ষিণ উপজেলায়ও সন্ধ্যার পর বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩৭ কিশোরকে আটক করা হয়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের থানায় নেওয়ার পর অভিভাবকদের ডেকে সন্তানদের চলাফেরার বিষয়ে সতর্ক করা হয়। ভবিষ্যতে সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে বাইরে ঘোরাফেরা না করার বিষয়ে মুচলেকা নিয়ে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
কচুয়া উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৬২ কিশোরকে আটক করে পুলিশ। রোববার সন্ধ্যার পর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা, বাজার, সড়কের মোড় ও কিশোরদের আড্ডাস্থলে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
হাইমচর উপজেলায়ও বিশেষ অভিযানে ৪৮ কিশোরকে আটক করেছে থানা পুলিশ। সন্ধ্যার পর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। পরে কিশোরদের বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য যাচাই এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কিশোরদের মাদক, কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়া ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
হাজীগঞ্জে সন্ধ্যার পর বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩৭ কিশোরকে আটক করে পুলিশ। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের থানায় নেওয়া হয়। পরে অভিভাবকদের থানায় ডেকে সন্তানদের চলাফেরা ও সন্ধ্যার পর বাইরে অবস্থানের বিষয়ে সতর্ক করা হয়। ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনে বাইরে ঘোরাফেরা না করার বিষয়ে মুচলেকা নিয়ে কিশোরদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
এক রাতের ব্যবধানে জেলার আট উপজেলায় ৩৫৮ কিশোরকে আটক করার ঘটনায় কিশোরদের সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে বাইরে ঘোরাফেরা ও আড্ডার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। তবে পুলিশ বলছে, এসব অভিযান কেবল আটক বা শাস্তির জন্য নয়; কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই সতর্ক করে স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবনে ফিরিয়ে আনাই মূল উদ্দেশ্য।
পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং সন্ধ্যার পর কীভাবে সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কিশোরদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সুনির্দিষ্ট অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা ঠেকাতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।