চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাত্তলা গ্রামের আলোচিত গৃহবধূ রিগান আক্তার মীম (২৬) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। ঘটনার পর ডাকাতির গল্প ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হলেও তদন্তে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।

পারিবারিক বিরোধ ও প্রতিহিংসার জেরেই ছোট জা কাজী সুমাইয়া আক্তার মিনা (২৩) বড় জা মীমকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। পরে ঘটনাটিকে ডাকাতির রূপ দিতে সাজানো হয় পুরো নাটক।

বুধবার (১৬ জুলাই) গ্রেপ্তার হওয়া আসামি কাজী সুমাইয়া আক্তার মিনা বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আদালতে তিনি স্বীকার করেন, বাড়িতে কোনো ডাকাতি হয়নি। পরিকল্পিতভাবেই তিনি বড় জাকে হত্যা করেন এবং পরে নিজেকে আহত ও বাঁধা অবস্থায় দেখিয়ে ঘটনাকে ডাকাতির মোড় দেওয়ার চেষ্টা করেন।

নিহত রিগান আক্তার মীম ওই গ্রামের মৃত সেলিম বেপারীর পুত্রবধূ। তিনি আড়াই বছর বয়সী কন্যা সাইফা ও মাত্র চার মাস বয়সী ছেলে সিরাজের জননী। তার স্বামী রনি ঢাকায় চাকরি করেন। ঘটনার সময় বাড়িতে দুই গৃহবধূ, পরিবারের প্রবীণ সদস্য নুরুল ইসলাম এবং তিনটি শিশু অবস্থান করছিল।

ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে। ঘটনার পর ছোট জা সুমাইয়া দাবি করেন, মুখ বাঁধা দুই ডাকাত ঘরে ঢুকে তাকে ও তার তিন মাস বয়সী সন্তানকে ছুরির মুখে জিম্মি করে। তিনি জানান, ডাকাতরা তার হাত ওড়না দিয়ে বেঁধে মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে এবং স্বর্ণালংকার লুট করে পাশের কক্ষে প্রবেশ করে। পরে তিনি বড় জায়ের কান্নার শব্দ শুনলেও বাঁধা অবস্থায় তাকে সাহায্য করতে পারেননি বলে দাবি করেন।

পরিবারের প্রবীণ সদস্য নুরুল ইসলাম জানান, রাতে তিনি বাড়ির লোহার গেটে তালা লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। চিৎকার শুনে উঠে দেখেন গেটের তালা নেই, পরে বাড়ির বাইরে অক্ষত অবস্থায় তালাটি পাওয়া যায়।

প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন জানান, মীমের ঘর থেকে আর্তচিৎকার শুনে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে অন্যদের ডাকেন। পরে মসজিদের মাইকে ডাকাত পড়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। স্থানীয়রা বাড়ির পূর্ব পাশের একটি জানালার কপাট খোলা দেখতে পান। ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে ছোট গৃহবধূকে বাঁধা অবস্থায় এবং অপর কক্ষে মীমকে গলায় ওড়না পেঁচানো অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসকের কাছে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার খবর পেয়ে শাহরাস্তি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান এবং সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (কচুয়া সার্কেল) মো. আব্দুল হাই চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চাঁদপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায় এবং ঘটনাটির তদন্ত শুরু করে।

তদন্তে ঘটনাস্থলের আলামত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বিভিন্ন অসঙ্গতি বিশ্লেষণ করে পুলিশের সন্দেহের তীর ছোট জা কাজী সুমাইয়া আক্তার মিনার দিকে যায়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেন। আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতেও তিনি একই বক্তব্য দেন।

পুলিশ জানায়, এটি কোনো ডাকাতির ঘটনা নয়; বরং পারিবারিক বিরোধের জেরে সংঘটিত একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তদন্তে সংগৃহীত আলামত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আসামির স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মামলার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে।

এদিকে, মীমের মৃত্যুতে আড়াই বছরের মেয়ে সাইফা ও মাত্র চার মাস বয়সী ছেলে সিরাজ মাতৃহারা হয়েছে। ঘটনার দিন দুই শিশুকে বুকে জড়িয়ে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। রহস্য উদঘাটনের পর এলাকায় স্বস্তি ফিরলেও নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে এখনও শোকাহত স্থানীয়রা। নিহতের পরিবার আসামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।