মোঃ নূরে আলম//

“Care for Her, Care for All” — এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আট জন তরুণ-তরুণীর উদ্যোগে যাত্রা শুরু হয় উন্নয়নমূলক সংগঠন “প্রত্যয় :: Protyoy”এর। তাদের বিশ্বাস, একজন নারীর সুস্থতা ও মর্যাদার প্রশ্নে নীরবতা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সহমর্মিতা কারণ একজন নারী ভালো থাকলেই তাঁর হাত ধরে ভালো থাকে একটি পরিবার, একটি সমাজ।

সংগঠনটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হলেন— মাহিন আলম আম্মান, এহতেশাম কবীর তৃ, শোহার্তো আলম প্রান্তি, মো. ফাহিম ইসলাম, ইসরাত জাহান মীম, মোঃ মাহফুজুর রহমান, মুমতাহিনা মিজান এবং আফসানা আক্তার মিমি। সংগঠনের সম্মানিত উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন তরু শাহরিয়ার স্বর্গ, যিনি একজন উন্নয়নকর্মী, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। উল্লেখ্য, সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে মাহিন আলম আম্মান এবং মো. ফাহিম ইসলাম একইসঙ্গে ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ ঢাকা উত্তর জেলা বোর্ডের কমিটি সদস্য এবং অ্যান্টি চাইল্ড ম্যারেজ অর্গানাইজেশনের (ACMO) সক্রিয় সদস্য হিসেবেও দায়িত্বে আছেন।

গত ২৭ জুন রাজধানীর করাইল বস্তিতে এই কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। ঘিঞ্জি গলিপথ, টিনের চালে রোদের প্রতিফলন আর জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত মানুষের ভিড়ের মাঝে ছোট্ট একটি জায়গায় বসে যায় ভিন্ন রকম এক আসর যেখানে কথা হয় মনের, কথা হয় মায়ের, কথা হয় না-বলা কষ্টগুলোর। আয়োজনে সহযোগিতা করে ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ ঢাকা উত্তর জেলা বোর্ড এবং অ্যান্টি চাইল্ড ম্যারেজ অর্গানাইজেশন (ACMO)। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সহ-প্রতিষ্ঠাতারা।
করাইলে নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়, যা পরিচালনা করেন ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ ঢাকা উত্তর জেলা বোর্ডের কমিটি সদস্য তাবাসসুম বিনতে শহীদ। কর্মশালার শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞেস করা হয় “আজকে আপনার মন কেমন আছে?” এত সহজ একটা প্রশ্ন, অথচ এই প্রশ্নটাই যেন বহুদিন কেউ করেনি অনেককে। এখান থেকেই শুরু হয় এক খোলামেলা আলোচনা, যেখানে শিশু-কিশোরী থেকে বিভিন্ন বয়সী নারীরা অংশ নেন। সংসারের চাপ, সন্তানের চিন্তা ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মতো দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা কীভাবে নিঃশব্দে মনের ভেতর জমে থাকে, আর কষ্ট প্রকাশ করা যে দুর্বলতা নয় বরং সাহসের পরিচয় এ নিয়ে কথা হয়। ঘুম-খাওয়ার সঙ্গে মনের সম্পর্ক এবং আত্মযত্নের গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা হয়। নিজেকে একটু ভালো রাখতে পারলেই যে পুরো পরিবারটাকে ভালো রাখা সম্ভব, এই ছোট সত্যটা যেন অনেকের কাছে নতুন এক উপলব্ধি হয়ে আসে।
এরপর অ্যান্টি চাইল্ড ম্যারেজ অর্গানাইজেশনের (ACMO) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ঋদ্ধিকা চাকমা করাইলে কিশোরী মেয়েদের প্রতি যত্ন এবং পরিবারে মায়ের ভূমিকা বিষয়ে একটি সচেতনতামূলক কর্মশালা পরিচালনা করেন। অরিগামি গেম ও গানের সুরে অংশগ্রহণকারীদের মন জয় করে নেন তিনি— হাতে হাতে কাগজ ভাঁজ হতে হতে যেন খুলে যায় মনের ভাঁজও। তিনি আলোচনা করেন, মায়েরা কিশোরী সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলে, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে কীভাবে নিরাপদ ও সুন্দর বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করতে পারেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক বয়সে বিয়ের ক্ষতিকর প্রভাব এবং কন্যা সন্তানের যথাযথ যত্ন ও শিক্ষার সুফল নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।

দুটি কর্মশালাতেই উপস্থিত নারীরা নিজেদের প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি অকপটে তুলে ধরেন। কারো চোখে জল, কারো মুখে হাসি সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত ও আন্তরিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে নীরবতা ভেঙে কথা বলে ওঠে অনেক না-বলা গল্প।
কর্মশালার শেষে ঋদ্ধিকা চাকমা বলেন, “আম্মা, আজকে আপনি এখানে এসেছেন, সচেতন হচ্ছেন। আপনি সচেতন হলে আপনার পরিবার সচেতন হবে, আর এভাবেই একদিন পুরো সমাজ ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাবে।” এই বার্তার রেশ নিয়েই করাইলের সংকীর্ণ গলি পেরিয়ে ফিরে যান সবাই— মনে একটু আলো, একটু আশা সঙ্গে করে।